একমাত্র সন্তানের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করতে করতে সর্বস্বান্ত অসহায় পিতা
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
একমাত্র সন্তানের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করতে করতে সর্বস্বান্ত অসহায় পিতা
জ্যোতির্ময় সাহা চড়িলাম, ২৯ জুলাই:
"একমাত্র সন্তান" - এই দুটি শব্দের সম্মুখীন হতে হয়েছে বারবার... বহুবার। বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যায়, যখনই দেখি যে. "একমাত্র সন্তান কিন্ত বিকলাঙ্গ". "একমাত্র সন্তানের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা করতে করতে পথের ভিখারী বনেছেন পিতা মাতা" ইত্যাদি ইত্যাদি।
দিলীপ চৌধুরি এবং কমলি চৌধুরীর একমাত্র সন্তান দ্বীপজিৎ চৌধুরী। বর্তমানে দ্বীপজিৎ চৌধুরীর বয়স মাত্র ১২। ছেলেটি কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে সারাটা দিন। ২০১১ সালে দিলীপ এবং কমলির ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় দীপজিৎ চৌধুরী। ছেলের জন্মের পর থেকে ১৬ মাস পর্যন্ত আনন্দে আত্মহারা ছিল পরিবারটি। এই ষোল মাসে বহু জল বয়ে গেছে হাওড়া নদীতে।
১৬ মাস পর একদিন গভীর রাতে মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে ঘুমে অচেতন ছিল আপন কুটিরে এই দীপজিত। তার মাও পরম তৃপ্তিতে ছেলেকে আগলে ধরে নিদ্রায় মগ্ন ছিল। বাড়িতে "যুবা বালক বৃদ্ধ" কেউই জেগে নেই। হঠাৎ করে গভীর রাতে মায়ের কোলে শিশুটি চিৎকার দিয়ে ওঠে ক্রমাগত কাঁদতে থাকে। কোনভাবেই তার চিৎকার এবং কান্নাকে থামানো যাচ্ছিল না। রাত ফুরিয়ে সকাল, যন্ত্রণায় চিৎকার এবং কান্নার ইতি নেই। শেষমেষ স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে শিশুটিকে নিয়ে যায় আগরতলা হারাধন সংঘের নিকট শিশু বিশেষজ্ঞ ডঃ বিকাশ রায়ের কাছে। চিকিৎসক শিশুটির অনেকগুলো টেস্ট করান। টেস্টের রিপোর্টগুলি নিয়ে যখন দিলীপ চৌধুরী চিকিৎসককে দেখান তখন ডঃ বিকাশ রায় অবাক হয়ে যান। উনি বলেন শিশুটির "ইবিটা থ্যালাসেমিয়া" হয়েছে। শিশুটির শরীরে Red Blood Corpuseles, অর্থাৎ RBC তৈরি হচ্ছে না। এটা একটা ভয়ঙ্কর ব্যাধি।
শুরু হলো দিলিপের পরিবারে আমাবস্যার ঘন কালো রাত। ১৬ মাস বয়স থেকে চিকিৎসা শুরু করেছেন দিলীপ চৌধুরী। ছেলেটির বয়স বর্তমানে ১২। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা করে চলেছেন দিলীপ চৌধুরী। ছিল দুই দুইটি গাড়ি, ছিল স্টিল ফ্যাক্টরি। ছেলেটির চিকিৎসা করতে করতে জীবনের সমস্ত সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছেন বাবা দিলীপ চৌধুরী। ভারতবর্ষের বড় বড় সমস্ত হাসপাতালে নিয়ে গেছেন ছেলেকে, প্রতিটি হাসপাতাল বলেছে ছেলেটির Bone Marrow Transplant করতে হবে।
ভালো মানুষ ছিলেন জীষ্ণুবাবু, এলাকার জন্য কাজ করেছেন। যদি শাসক দলীয় নেতারা একটু বলতেন দীপজিতের শারীরিক অবস্থার কথা, তাহলে নিশ্চয়ই উনি সাহায্য করতেন- জানিয়েছেন দিলীপ চৌধুরী।কোন মাসে দুইবার, কোন মাসে তিনবার, কোন মাসে আবার ৪ বার- দ্বীপ জিতের রক্ত পাল্টাতে হয়। কারণ তার শরীরে লাল রক্ত কণিকা বা RBC তৈরি হচ্ছে না। লাল রক্ত শরীরে দিতে হয় এবং ভাত সহ অন্যান্য খাবার সে খেতে পারে না চিকিৎসকের পরামর্শ মত অত্যন্ত দামি দামি খাবার এনে দিতে হয় এবং প্রতি মাসে প্রচুর টাকার ঔষধ খাওয়াতে হয় তাকে। এই সমস্ত কিছু করতে করতে একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন দিলীপ চৌধুরী।
চড়িলাম বাজার স্ট্যান্ড থেকে ব্লকের দিকে যাওয়ার রাস্তার পাশে জুতো বিক্রি করে এখন সংসার চালাচ্ছেন এবং ছেলের চিকিৎসার খরচও জোগাচ্ছেন এক সময়ের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী দিলীপ চৌধুরী। কি করবেন, কোথায় যাবেন কার কাছে যাবেন, সব অজানা- ধোঁয়াশা। ছেলের এত বড় রোগ অথচ তাকে আজ পর্যন্ত আয়ুষ্মান কার্ড অথবা স্মার্ট কার্ড কিছুই দেওয়া হয়নি। এই কাজগুলোর জন্য বহুবার দাবি করেছেন স্থানীয় প্রশাসনের কাছে। কমলী চৌধুরী চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছেন আজ আমরা জীবিত রয়েছি, তাই তাকে চিকিৎসা ও দেখাশোনা করতে পারছি। আমরা মরে গেলে দীপ জিতের কি হবে?? দিবারাত্র স্বামী-স্ত্রী এই ভাবনাতেই নিজেরাও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

সঙ্গে সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী একাধিক জায়গায় ফোন করেছেন এবং আমেরিকার এক চিকিৎসকের অ্যাপোয়েন্টমেন্ট পেয়েছেন দিলীপ চৌধুরী! সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখ ওই চিকিৎস দেখবেন দ্বীপজিৎ চৌধুরীকে। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি স্কিমের অধীন চিকিৎসা করানো হবে দীপজিৎ চৌধুরীকে। মানবদরদী মুখ্যমন্ত্রী, বাড়িয়ে দিয়েছেন সাহায্যের হাত, PROMISE করেছেন - "WE WILL TRY". দিলীপ এবং কমলী এবার আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। ঘরের সমস্ত আঁধার যেন সরে গেছে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির আলোর রোশনায়। আনন্দে ভরে উঠেছে তাদের সংসার।
শনিবার দিন সকাল বেলা এই কলমচির সামনে কথা বলতে গিয়ে চোখের জল ফেলে দিয়েছেন দিলীপ চৌধুরী। উনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন যাতে ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি রাজ্যে মানিক সাহার মত এমন মানবিক মুখ্যমন্ত্রীর জন্ম হয়, নেতা হলে এমন নেতা যেন হয়।
বর্তমানে দ্বীপজিৎ চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার এতটা অবনতি হওয়ার পরেও সে ভারতরত্ন অটল বিহারী বাজপেয়ি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াশোনা করে। হয়ত সেও জানে সে বেশি দিনের অতিথি নয় এই পৃথিবীতে, যদি না তার Bone Marrow Transplant করা হয়।এরপরেও মনের শক্তি নিয়ে সে পড়াশুনা করছে।
জীবনের "সমস্ত আয় উপার্জন" সম্পদ শেষ করে ফেলেছেন স্বামী স্ত্রী একমাত্র সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। মুখ্যমন্ত্রী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় অত্যন্ত খুশি পরিবারটি। বাঁচার আলো দেখতে পাচ্ছে স্বয়ং দ্বীপ জিত__মানবিক মুখ্যমন্ত্রী ডক্টর মানিক সাহাকে এভাবেই হাতজোড় করে প্রণাম ও কুর্নিশ জানিয়েছেন দিলীপ চৌধুরী।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের সাংবাদিক বন্ধু উত্তম সিনহা - এই প্রতিবেদনটি পড়তে গিয়ে নিজেও কেঁদে ফেললেন। দিলীপ বাবুর দ্বীপজিৎ, এবং উত্তম বাবুর কূলদীপ- কি অদ্ভুত মিল। দিলীপবাবুকে লড়াই চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেছেন উত্তম সিনহা।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন